বাংলাদেশ ১২ মাসে নিজস্ব “সার্বভৌম AI” চালু করবে: বিষয়টা কী, সাধারণ মানুষের কী লাভ? (প্রশ্নোত্তরে)
প্রধানমন্ত্রীর ICT উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছেন, ১২ মাসের মধ্যে দেশের নিজস্ব AI অবকাঠামো চালু হবে, যেখানে বাংলা ভাষার AI মডেল বানানো যাবে। এটা কী, কারা ব্যবহার করতে পারবে, চ্যালেঞ্জ কোথায়: সহজ প্রশ্নোত্তরে।
ঢাকা, ৮ অক্টোবর ২০২৬: প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও ICT বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশ নিজস্ব “সার্বভৌম AI” অবকাঠামো চালু করবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত “AI and Innovation Dialogue”-এ তিনি এ কথা বলেন। The Daily Star এই খবর প্রকাশ করেছে।

প্রশ্ন ১: ঠিক কী ঘোষণা করা হয়েছে?
সংবাদ অনুযায়ী ঘোষণার মূল বিষয়গুলো:
- ১২ মাসের মধ্যে দেশের জাতীয় AI অবকাঠামো চালু করা হবে।
- শুরু হবে ছোট আকারে, ধাপে ধাপে বাড়ানো যায় এমন (modular) ব্যবস্থা দিয়ে, একবারে বিশাল কেন্দ্র বানিয়ে নয়।
- বেসরকারি চাহিদা বেশি হলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে নিজেদের যন্ত্রপাতি রাখতে পারবে।
- উপদেষ্টার ভাষায়: “We have secured the sourcing of computing chips”, অর্থাৎ কম্পিউটিং চিপ সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে।
বাজেট কত, কোন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ, বা কোথায় বসানো হবে, এসব খবরে জানানো হয়নি।
প্রশ্ন ২: “সার্বভৌম AI” মানে কী?
সহজ কথায়: বিদেশি কোম্পানির AI ভাড়া না করে দেশের নিজস্ব কম্পিউটার, নিজস্ব ডেটা আর নিজস্ব জনবল দিয়ে AI বানানো ও চালানোর ক্ষমতা। এখন আমরা ChatGPT বা Gemini ব্যবহার করলে আমাদের লেখা আর তথ্য যায় বিদেশি কোম্পানির সার্ভারে, আর নিয়মকানুনও ঠিক করে তারাই।
প্রশ্ন ৩: বাংলা ভাষার নিজস্ব AI কেন দরকার?
বিদেশি AI টুল বাংলায় কাজ করে, কিন্তু সবসময় নিখুঁত না। আমাদের নিজেদের পরীক্ষাতেই এর প্রমাণ পেয়েছি:
- iPhone-এর মাইক্রোফোনে “আজ বিকেল পাঁচটায়” বলতেই লেখা হয়েছে “Aaja Bike pasta” (পুরো পরীক্ষা)।
- বাংলা বাগধারা “মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া” অনুবাদে Google Translate প্রায় আক্ষরিক অনুবাদ করেছে, আর ChatGPT অর্থটা হালকা করে ফেলেছে (পুরো পরীক্ষা)।
বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আর সরকারি কাজের ভাষা দিয়ে প্রশিক্ষিত মডেল হলে এই ধরনের ভুল কমার কথা।
প্রশ্ন ৪: সাধারণ মানুষ কি সরাসরি ব্যবহার করতে পারবে?
ঘোষণা অনুযায়ী অবকাঠামোটা খোলা হবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় আর শিক্ষার্থীদের জন্য। মানে প্রথমে এটা মূলত যারা AI বানাবেন তাদের জন্য। সাধারণ মানুষ সম্ভবত পরে এর ওপর বানানো অ্যাপ বা সেবার মাধ্যমে সুবিধা পাবেন। সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি কোনো অ্যাপের ঘোষণা খবরে নেই।
প্রশ্ন ৫: চ্যালেঞ্জ কোথায়?
উপদেষ্টা নিজেই কয়েকটা বাধার কথা বলেছেন:
- দামি GPU চিপ: সরকার থেকে সরকার আলোচনায় চেষ্টা চলছে, কিন্তু টাকা থাকলেও ডেলিভারি পেতে কয়েক বছর লাগতে পারে।
- বিদ্যুৎ আর পানি: তাঁর দেওয়া হিসাবে, একটা AI উত্তরে প্রায় ২.৯ ওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ লাগে, সাধারণ সার্চে প্রায় ০.৩ ওয়াট-ঘণ্টা। তাই জায়গা বাছাই হবে বিদ্যুৎ আর পানির কথা ভেবে, নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ।
প্রশ্ন ৬: বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
১২ অক্টোবর The Daily Star-এ প্রযুক্তি নির্বাহী সাব্বির আহমদ লিখেছেন, বাংলাদেশের AI শুধু ভাড়া করে ব্যবহার করা উচিত না। তাঁর মতে, বিদেশি টুলে AI-এর মূল ক্ষমতা আর লাভের বড় অংশ থেকে যায় দেশের বাইরে। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে আছে:
- জাতীয় AI কম্পিউটিং ব্যবস্থাকে সবার জন্য ন্যায্যভাবে উন্মুক্ত অবকাঠামো হিসেবে দেখা।
- সরকারি কেনাকাটায় একটা কোম্পানির ওপর নির্ভরতা এড়ানো।
- কতজন প্রশিক্ষণ পেল শুধু তা না, দেশে কতটা মূল্য থাকল সেটাও মাপা।
- স্টার্টআপে বিনিয়োগ বাড়ানো। তাঁর দেওয়া তথ্যে, ২০২৬-এর প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশি স্টার্টআপ মাত্র ৬০ লাখ ডলার পেয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৯৫% কম।
প্রশ্ন ৭: এর আগে বাংলা AI নিয়ে কী হয়েছে?
২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ICT বিভাগের আয়োজনে ঢাকায় “Kagoj.ai” নামে বাংলা ভাষার AI প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করা হয়েছিল, বাসস-এর খবর অনুযায়ী। এটা বাংলা লেখা, সরকারি নথি তৈরি আর কনটেন্ট বানানোয় সাহায্য করে। তখন জানানো হয়েছিল, এর API আর সোর্স কোড সবার জন্য খোলা হবে।
প্রশ্ন ৮: আপনার জন্য এর মানে কী?
| আপনি যদি… | সম্ভাব্য সুবিধা |
|---|---|
| শিক্ষার্থী বা গবেষক | দেশের কম্পিউটিং সুবিধা ব্যবহার করে AI শেখা আর গবেষণার সুযোগ |
| স্টার্টআপ বা ডেভেলপার | বাংলা AI সেবা বানানোর অবকাঠামো, কম খরচে হলে আরও ভালো |
| সাধারণ ব্যবহারকারী | ভবিষ্যতে বাংলায় আরও নির্ভুল AI অ্যাপ আর সরকারি সেবা |
তবে এগুলো এখনো পরিকল্পনা। ১২ মাস পর আসলে কী চালু হলো, তা দেখেই বলা যাবে। আমরা খবরটা অনুসরণ করব।
সাথে আরেকটা খবর: ডিপফেক নিয়ে সাইবার আইন সংশোধনের প্রস্তাব
Global Voices-এর ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, AI দিয়ে বানানো ভুয়া ছবি ও ভিডিও (ডিপফেক) দিয়ে নারীদের হয়রানির ঘটনা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সাইবার সুরক্ষা আইনের একটা সংশোধনী খসড়া আলোচনায় আছে, যাতে শাস্তি বাড়ানোর প্রস্তাব আছে। খসড়াটা এখন একটা মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের কেউ কেউ এর কিছু বিতর্কিত ধারা বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অক্টোবরের আন্তর্জাতিক AI খবর পড়ুন: অক্টোবর ২০২৬-এ AI-এর ৬টা বড় খবর।
সূত্র
- Bangladesh to launch ‘sovereign AI’ in a year (The Daily Star, ৮ অক্টোবর)
- Bangladesh to launch sovereign AI within a year (The Daily Star, ৯ অক্টোবর)
- Bangladesh cannot afford to rent its AI future (The Daily Star, ১২ অক্টোবর)
- First Bangla AI platform ‘Kagoj.ai’ launched (বাসস)
- Bangladesh weighs tougher cyber law as AI-generated abuse targets women (Global Voices, ২৮ অক্টোবর)
